Mokhles Chowdhury

বঙ্গভবনের সেই দিনগুলো

 বঙ্গভবনের সেই দিনগুলো - ১

২০০৭ সালের ২২শে জানুয়ারির নির্ধারিত নবম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দল অংশ নিয়েছিল। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোটও সেই নির্বাচনে অংশ নেয়। অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, এখন এ বিষয়ট বর্ণনা করার কারণ কি? হ্যাঁ, অবশ্যই কারণ আছে। যারা সংবিধান অনুযায়ী দায়িত্ব পালনকারী ২০০৬-২০০৭ইং এর নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনে নির্বাচন অনুষ্ঠান সম্পর্কে প্রশ্ন তুলছিলেন তাদের জন্য এই উত্তর দিতে হচ্ছে। প্রশ্ন উঠতে পারে, তাহলে সেই নির্বাচন হলো না কেন? সাবেক প্রেসিডেন্ট হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মনোয়য়ন বাতিলের ঘটনা ছিল এখানে ট্রাম্পকার্ড। এ ঘটনাই প্রধান বিরোধী দলকে নিবাচন বর্জন করার সুযোগ করে দেয়। রির্টানিং অফিসাররা দেশের পাঁচটি নির্বাচনী এলাকায় জেনারেল এরশাদের মনোনয়ন বাতিল করার কারণে পরিবর্তিত পরিস্থিতি সৃষ্টির সুযোগ আসে। আমরা সাধ্যমতো চেষ্টা করছি যাতে নির্বাচনটি হয় এবং সকল সকল দলের অংশগ্রহনের ভিত্তিতে একটি গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য দিন-রাত কাজ করেছি। প্রেসিডেন্টের বিশেষ দূত হিসেবে আমি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্ট দুই নেত্রীর সঙ্গে আলদাভাবে একান্ত বৈঠক করে সমস্যা সমাধানের কাছাকাছি উপনীত হই। পরে সেনারগাঁও হোটেল কমপ্লেক্সে প্রধান বিরোধী দলেল দাবিনামা নিয়ে বসে সমাধানযোগ্য বিষয়গুলো নির্ধারণ করি ক্রমাগত তিন দিন বৈঠক করে।

মনোয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন সর্বশেষ আরও দু’দিন বাড়ানোর জন্য আওয়ামীলীগ থেকে বার বার দাবি জানানো হচ্ছিল। বলা হয়েছিল, এটিই তাদের শেষ দাবি। এর আগে একটি দাবি মানতেই আরেকটি দাবি দেয়া হচ্ছিল। তাই আর দাবি মানার ব্যাপারে অনেকের আপত্তি ছিল। কিন্তু আমরা সকল দলের অংশগ্রহনের মাধ্যমে নির্বাচন করতে কাজ করছিলাম। এইচএম এরশাদ মনোনয়নপত্র বাড়ানোর দাবির এই অবস্থায় অর্থাৎ মনোয়নপত্র প্রত্যাহার প্রথমে নির্ধারিত তারিখের আগের রাতে প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের কাছে তিনবার ফোন করেছিলেন। কাজী জাফর আহমদ করেছিলেন দু’বার। প্রেসিডেন্ট বিভিন্ন প্রোগ্রাম, খাওয়া ও চিকিৎসা সংক্রান্ত কাজে ব্যস্ত ছিলেন। পরে যখন রিং ব্যাক করা হলো তখন জেনারেল এরশাদ বললেন, মনোয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ তারিখ আর বাড়ানোর প্রয়োজন নেই। আওয়ামীলীগ নির্বাচন বর্জন করলেও আমরা নির্বাচন করবো। সারা দেশের সব নির্বাচনী এলাকায় এ জন্যই আমাদের আলাদা প্রাথী দেয়া আছে। কিন্তু আমরা সকলেই চাচ্ছিলাম ১৯৮৮ বা ১৯৯৬ এর ১৫ই ফেব্রুয়ারী মতো নির্বাচন না করতে। সকল দলের অংশগ্রহনে নির্বাচন করতে। ওই রাতে বঙ্গভবনে দুজন উপদেষ্টা মাহবুবুল আলাম ও ড. শোয়েব আহমদ উপস্থিত ছিলেন। প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে উপদেষ্টাদের নিয়মিত চা-চক্রের অংশ হিসেবে তারা এসছিলেন। এছাড়া, মনোয়নপত্র জমা দেয়ার শেষ দিন বাড়ানোর দাবির পক্ষেও তারা কথা বলছিলেন।

অনেক ত্যাগ ও কষ্টের বিনিময়ে যে আওয়ামী লীগকে আমরা নির্বাচনে নিয়ে এসেছিলাম সেই শ্রম সফল করতে ওই রাতেই আমরা মনোনয়নপত্রও জমা দেয়ার শেষ তারিখ দু’দিন বাড়ানোর ঘোষণা দিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগ এ সিদ্ধান্তে খুশি হয়েছিল। দেশ ও জাতির বৃহত্তর স্বার্থে আমরা নির্বাচন কমিশনকে অনুরোধ করে এভাবে নির্বাচনের তারিখ বার বার পেছাচ্ছিলাম আওয়ামী লীগের দাবি মানতে গিয়ে। কিন্তু রিটানিং অফিসারদের মনোনয়নপত্র বাছাইয়ের সময় এরশাদের মনোনয়নপত্র বাতিল করার ঘটনা এসব উদ্যোগ আয়োজন তছনছ করে দেয়। চারটি আসনে রটানিং অফিসার ছিলেন ডিসি। তারা একই রকম সিদ্ধান্ত দিয়েছিলেন। আর ঢাকায় রিটার্নিং অফিসার ছিলেন অতিরিক্ত বিভাগীয় কমিশনার। ঢাকায় এরশাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণের যোগ্যতা অর্থাৎ মনোনয়ন গ্রহণ বা বাতিল-এ ব্যাপারে সুস্পস্ট সিদ্ধান্ত ছাড়াই প্রথমে কাগজ পাঠানো হয়েছিল নির্বাচন কমিশনে। ইতিমধ্যে সিলেট, হবিগঞ্জ, রংপুর ও নীলফামারী থেকে রিটার্নিং অফিসারদের পাঠানো সিদ্ধান্ত ইলেকট্রনিক মিডিয়ার প্রচারিত হচ্ছিল। নির্বাচন কমিশন ঢাকার রিটার্নিং অফিসারকেই তখন সিদ্ধান্ত দিতে বলেছিল। অন্যান্য রিটানিং অফিসারের সিদ্ধান্ত ফলো করা হয় তখন। এরশাদের নির্বাচনে অংশগ্রহণ প্রশ্নে আমরা নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে দফায় দফায় কথা বলেছিলাম কিন্তুতারা বিধির উল্লেখ করে বলেছিলেন, এ বিষয়ে রিটানিং অফিসারের সিদ্ধান্তই চূড়ান্ত। নির্বাচন কমিশনের কিছু করা নেই। পরে যথারীতি জেনারেল নির্বাচন কমিশনে আপিল করেছিলেন এবং বিধি অনুযায়ী তা খারিজ করে দেয়া হয়।

রাষ্ট্র পরিচালনার ক্ষেত্রে আমরা একেবারে নিম্ন পযায়েও কোন হস্তক্ষেপ করিনি। ডিসি ইউএনও কোন পর্যায়েই নয়। আমরা চেয়েছিলাম প্রশাসন স্বাধীনভাবে কাজ করবে। কিন্তু সেদিন কেন এবং কিভাবে এ ঘটনা ঘটেছিল সে প্রশ্নে র উত্তর আজও খুঁজে পাইনি। কেবল দাবির পর দাবিই নয়, রাজনৈতিক সংকট সমাধানে আমরা এমন সব দায়িত্ব পালন করেছি যার ফিরিস্তি হবে অনেক লম্বা। যেমন সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া একদিন রাতে ফোন করে পরের দিন রাতে প্রেসিডেন্টের প্রোগ্রাম চেয়েছিলেন। চারদলীয় জোটের যেসব নেতা তার সঙ্গে থাাকবেন তিনি তাদের নামের তালিকাও দিয়েছিলেন। পরদিন রাত সাড়ে ৯ টায় তার ওই প্রোগ্রাম কনফার্ম করে দিয়েছিলাম। সামরিক-বেসামরিক সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায়ে ওই প্রোগ্রাম চলে গিয়েছিল। পরদিন সকালে আরেক সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা একই দিন সন্ধ্যায় প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে চান। মহাজোটের নেতৃবৃন্দ যারা তার সঙ্গে থাকবেন যথারীতি তাদের তালিকাও দেন। ওই দিন সারাদিন প্রেসিডেন্টের প্রোগ্রাম ছিল এবং রাতে দুই সাবেক প্রধানমন্ত্রীর প্রোগ্রাম যুক্ত হওয়াররপর ফুরসত নেয়ার সময় ছিল না। কিছুদিন আগে গুরুতর অসুস্থ অবস্থা থেকে আরোগ্য লাভকারী প্রেসিডেন্টের ওপর এভাবে চাপ দেয়ার বিরুদ্ধে তার মেডিকেল বোর্ড ক্ষুব্ধ ছিল। শেখ হাসিনা যখন ফোনে সময় চাচ্ছিলেন তখনই আর কোন প্রোগ্রামের জন্য সময় দেয়া মেডিকেল বোর্ডের বারণ ছিল কঠোরভাবে। কিন্তু একজন সাবেক প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনাকে সম্মান করে প্রোগ্রাম দিয়ে ফেলেছিলাম। কিছুক্ষন পর তিনি জানতে চান ওই দিন রাত সাড়ে ৯টায় বেগম জিয়ার সঙ্গে প্রেসিডেন্টের কোন প্রোগ্রাম আছে কিনা? আমি হ্যাঁসূচক জবাব দিলে বলা হয়, তাকে ওই সময় দিতে এবং বেগম জিয়াকে সময় সন্ধ্যা ৭টায় (যে সময় শেখ হাসিনাকে দেয়া হয়) নিয়ে আসতে। বেগম খালেদা জিয়াকে এ বিষয়ে অনুরোধ করলে, তিনি বলেন, আমিতো আগের দিন রাতে সময় নিয়েছি। তাহলে প্রোগ্রাম বাদ দিন। এখন দু’দিক থেকেই সমস্যা হলো। দুটি প্রোগ্রামই বাদ হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা। একাদিকে রাজনৈতিক সংকট সমাধানের চেষ্টা, অন্যদিকে এই ইগো সঙ্কট এবং প্রশাসনিক কাযক্রম তো রয়েছেই- বলা চলে আমাদেরকে সারাক্ষণ স্নায়ুচাপের মধ্যে রেখেছল। প্রটোকল অনুযায়ী ইমিডিয়েট পাস্ট প্রাইম মিনিষ্টার বা সদ্য প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী হিসেবে সম্মান করতে গিয়ে ওই দিন সময় দেয়া হয়। সকাল থেকে বিকাল পর্যন্ত দুই নেত্রীর সঙ্গে এ নিয়ে যোগাযোগ করে বরফ গলাতে চেষ্ট করেছিলাম। বিভিন্ন পর্যায়ের উর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কেবল বলছিলেন, স্যার আপনি তাদেরকে বুঝিয়ে একটা ব্যবস্থা করুন। অথচ প্রটোকল অনুযায়ীও ইমডিয়েট পাষ্ট পিএম শেষে সময় পান। ২০০১ সালে এ রীতি অনুসরণ করে শেখ হাসিনাকে সব শেষে সময় দেয়া হয়। যা হোক শেষ পর্যন্ত বেগম জিয়া রাজি হন। স্বল্প সময় হাতে নিয়ে তিনি চারদল নেতৃবন্দকে নিয়ে সন্ধ্যা ৭টায় বঙ্গভবনে আসেন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে এ বৈঠক শেষ হতেই সাড়ে ৯ টায় বৈঠকে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে মহাজোট নেতৃবৃন্দ আসেন। উপদেষ্টা এবং প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে আমি যোগ দিই। শেখ হাসিনা প্রোগ্রামের সময় নিয়ে সৃষ্ট সমস্যা সমাধানের জন্য আমাকে ধন্যবাদও দিয়েছিলেন।

আমাদের সময় নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ছিলেল মোট ১৪ জন। একপর্যায়ে চারজন উ?পদেষ্টা পদত্যাগ করলে তাদের শূন্যস্থান পূরণে আরও চারজন উপদেষ্টা নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের সকলের সঙ্গেই আমার সুসম্পর্ক ছিল। তারা দেখেছিল রাজনৈতিক সঙ্কট সমাধানে কিভাবে রাত দিন নিরলস পরিশ্রম করেছিলাম। বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনার সঙ্গে আমার দর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সুসম্পর্ককে কাজে লাগিয়ে দুই নেত্রীর সঙ্গে আমার যোগাযোগ এবং সমস্যা সমাধানের প্রচেষ্টাকে সরকারের উপদেষ্টারাও এপ্রিসিয়েট করছিলেন। আমি তাদেরকে আলাদাভাবে যার যার মতো যোগাযোগ করতে বলি। ফলাফল ছিল একই। আমাদের মধ্যে সমস্বয়ের কোন সমস্যা ছিল না। দুই নেত্রীর সঙ্গে একান্তভাবে বসা এবং শেখ হাসিনার মনোনীত ও দায়িত্বপ্রাপ্তদের সঙ্গে বসে নির্বাচন করার স্বার্থে একটি সমাধানে উপনীত হওয়ার পর্যায়ে এসে প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টাসহ উপদেষ্টা পরিষদকে সময়ে সময়ে অগ্রগতি অবহিত করতাম।

আমাদের সামনে ছিল সংবিধান নির্ধারিত দুটি পথ। একটি দেশে সুষ্ঠু, অবাধ ও নিরপেক্ষ সংসদ নির্বাচন অনুষ্ঠান। আর অপরটি No Policy decision সরকারের day to day affair অর্থাৎ কেয়ারটেকার হিসেবে রুটিন দায়িত্ব পালন করা। সংবিধানের ১২৩ ও ৫৮ ধারা ও এসব ধারার উ?পধারাসহ মিলিয়ে আমরা সামনে অগ্রসর হচ্ছিলাম।

রাজনৈতিক নেতানেত্রীরা হচ্ছেন দেশ পরিচালনার দায়িত্বপ্রাপ্ত। জনগণের ভোটে তারা ক্ষমতায় আসেন। প্লেয়ার ছাড়া যেমন খেলা হয় না তেমন রাজনতিবিদদের অংশগ্রহণ করতে না দিলে নির্বাচন হবে না। এ মূলনীতি সামনে রেখে আমরা রানীতিকদের সঙ্গে সমঝোতার লক্ষ্যে কাজ করছলাম। যারা এ দেশে হাওয়া ভবন বানাতে মূল দায়িত্ব পালন করলেন এবং পরবর্তীতে বিএনপি থেকে সরে গেলো তারা আমাকে হাওয়া ভবনের এজন্ট, গুপ্তচর ইত্যাদি আখ্যা দিলেন। অথচ আমি হাওয়া ভবনে কখনও যোগাযোগ করিনি এবং হাওয়া ভবন থেকেও আমার সঙ্গে কখনও যোগাযোগ করা হয়নি। দুই নেত্রীর সঙ্গে যোগাযোগ করেছি। তারাও করেছেন। এসব নির্বাচন অনুষ্ঠান ও সঙ্কট সমাধানের জন্যই করতে হয়েছে। আমি যা কিছু করেছি প্রকাশ্যে, গোপনে নয়। কিছু মিডিয়া প্রচার করেছে আমি নাকি মোবাইল ফোনে মিটিংয়ের কথোপকথন ধারণ করে পাচার করেছি। ওয়ার্ল্ড ওয়াইড ফ্রি ফ্লো অব ইনফরমেশনের যুগে ট্রান্সপারেন্সির জমানায় কোন কিছুই গোপনীয় ছিল না। রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দও কোন গোপন মিটিং করতে বঙ্গভবনে আসতেন না। যা আলোচনা হতো সব দু’পক্ষের বক্তব্য হিসেবে প্রেসে যেতো। ব্রিফ্যিং দেয়া হতো। যে সমস্ত বিষয় আলোচনা হয়নি এমন সব অবান্তর ইস্যু কিছু কিছু মিডিয়ায় তখন স্থান পেয়েছে।

প্রেসিডেন্ট যখন প্রধান উপদেষ্টা হন তখন তাকে দায়িত্ব পালনের সহযোগিতার জন্য উপদেষ্টার প্রয়োজন হয়। প্রধানমন্ত্রী হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া ও শেখ হাসিনা দায়িত্ব পালনকালে সরকার প্রধানের উপদেষ্টা ছিলেন সালাহ্? উদ্দিন কাদের চৌধুরী (মন্ত্রী), অধ্যাপিকা জাহানারা বেগম (প্রতিমন্ত্রী), রিয়াজ রহমান (প্রতিমন্ত্রী), বরকত উল্লাহ বুলু (প্রতিমন্ত্রী), ও মাহমুদুর রহমান (উপমন্ত্রী), ডা. এসএ মালেক (মন্ত্রী), এম আনিসুজ্জামান (মন্ত্রী), খোন্দকার আসাদুজ্জামান (মন্ত্রী) ও সুরঞ্জিত সেনগুপ্ত (পদমর্যাদা দেয়ার কথা ছিল) প্রেসিডেন্ট যখন প্রধান উপদেষ্টা অর্থাৎ একসঙ্গে রাষ্ট্র ও সরকার প্রধান তখন এতজন কিংবা ডাবল উপদেষ্টা না নিয়ে রুলস অব বিজনেস অনুযায়ী এমনকি আইন মন্ত্রণালয়, এটর্নি জেনারেলসহ সংশ্লিষ্ট সকল পর্যায় থেকে ভেটিং করে একজন উপদেষ্টা নিয়েছিলেন। এটাকে না বুঝে অনেকে গুলিয়ে ফেলেছিলেন। অবশ্য ড. আকবর আল খান মিডিয়াকে তখন একাধিকবার এ প্রসঙ্গে সুষ্পষ্ট বক্তব্য দিয়ে বলেছিলেন, প্রেসিডেন্ট যতজন ই?চ্ছা উপদেষ্টা নিতে পারেন এবং অতীতেও নেয়া হয়েছে এবং কাজের স্বার্থে এটা প্রয়োজন। উপদেষ্টা হিসেবে মন্ত্রীর পদমর্যাদা দেয়ার কথা থাকলেও আমি প্রতিমন্ত্রী হিসেবেই রাজি হই। শেখ হাসিনা আওয়ামী লীগ ও মহাজোট নেতৃবৃন্দের সামনে বঙ্গভবনে আমাকে দেখে কনগ্র্যচুলেশনস বলে বলেছিলেন, হোয়াই স্টেট মিনিষ্টার, হোয়াই নট ফুল মিনিষ্টার ? কিন্তু আওয়ামী লীগের কিছু নেতা আমার বিরুদ্ধে নানা বক্তব্য দয়ে যাচ্ছিলেন।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে আওয়ামী লীগ রাজনৈতিক কারণে প্রেসিডেন্ট বানালেও তার হাত দিয়ে ২০০১ সালে বিএনপি ক্ষমতায় আসে। আবদুর রহমান বিশ্বাসকে একইভাবে বিএনপি প্রেসিডেন্ট বানালে তার হাত ধরে ক্ষমতায় আসে আওয়ামী লীগ। বিএনপি’র মনোনীত প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আমাকে উপদেষ্টা বানানোর কারণে আমাকে বিএনপি ধরা হলো কেন - সেটি আমার প্রশ্ন নয়। প্রশ্ন হচ্ছে, নির্বাচন সুষ্ঠ, অবাধ ও নিরপেক্ষ করতে আমরা কাজ করেছি কিনা। বাংলাদেশ ছাড়া আর কোন দেশে কেয়ারটেকার সরকার নেই। কিন্তু আমাদের দেশে সন্দেহ ও অবিশ্বাসের কারণে সংবিধানে এ সরকারের ঠাঁই? হয়েছে। এরপরও অবিশ্বাস থেকে আমরা মুক্ত হতে পারিনি। ২০০৭ সালের ২২ শে জানুয়ারির নির্বাচন নিরপেক্ষ হতো এবং বড় দল দু’টির যে কোনটিই ক্ষমতায় আসতে পারতো। কিন্তু এ বাস্তবতা ও এ ক্ষেত্রে গহীত সকল কার্যক্রমকে নস্যাৎ করা হয়েছে কিছু রাজনীতকের অবিমৃস্যকারিতার কারণে। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন ১৯৯১ সালে অস্থায়ী প্রেসডেন্টের দায়িত্ব পালনকালে বলেছিলন No body is neutral কিন্তু যার যার কাজটা নিরপেক্ষভাবে ও দায়িত্বশীলতার সঙ্গে করতে হবে। এটাই হচ্ছে বিধান।

প্রেসিডেন্ট একজন ব্যাক্তি নন, একটি ইন্সটটিউশন। এটি দেশের সর্বোচ্চ ইন্সটটিউশনও বটে। প্রেসিডেন্টের নাম বিকৃত করাসহ বিভিন্নভাবে এই ইন্সটিটিউশনকে অসম্মান পর্যন্ত করা হয়েছে। আমি শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত প্রেসিডেন্ট ইন্সটিটিউশনকে উর্দ্ধে তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

বিএনপি মহাসবিচ ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক পর্যায়ে সংলাপ শেষ পর্যন্ত ৩১ দফা থেকে এক দফায় পরিনত হয়েছিল। বলা হয়েছিল, বিচারপতি কে. এম. হাসান চলে গেলেই হবে। বিচারপতি হাসান অপারগতা প্রকাশ করার সঙ্গে সঙ্গে আমি প্রেসিডেন্টের পক্ষ থেকে আবদুল মান্নান ভূঁইয়া ও আবদুল জলিলের সঙ্গে যোগাযোগ করে স্বল্পমত সময়ে তাদেরকে প্রেসিডেন্টের সামনে হাজির করি। জনাব জলিল কেয়ারটেকার সরকার প্রশ্নে সংবিধানের ৬টি অপশন প্রসঙ্গে বললেন, প্রেসিডেন্ট তো আমাদের সকলের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক। তিনি দায়িত্ব নিলে তো আমরা? বেশি খুশি হবো। কারণ তিনি অসুস্থ হলে তো তাকে বাদ দেয়ার চেষ্টা হয়েছিল এবং আমরাই তার পক্ষে সোচ্চার হয়েছিলাম। বঙ্গভবনের গেটে টিভি ক্যামেরাগুলোর সামনে তিনি তখন গিয়ে বললেন, আলহামদুলিল্লাহ মহামান্য প্রেসিডেন্ট রাজি হয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব নিতে। সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাবে। ধানমন্ডিতে গিয়ে মটিং করে বললেন, মানি না। অথচ প্রেসিডেন্ট বলেছিলের সদ্যসাবেক দুজন প্রধান বিচারপতি সদ্য সাবেক আপিল বিভাগের দুজন সিনিয়র বিচারপতি বিভিন্ন কারণে দায়িত্ব নিতে না পারায় অর্থাৎ চারটি অপশন এক্সজস্টেড হওয়ায় পঞ্চম অপশন অনুযায়ী আপনারা দু পক্ষ একমত হোন। তারা প্রকমত হতে না পারলে ষষ্ট ও শেষ অপশন অনুযায়ী আই কুড অপার মাইসেলফ। দেশের স্বার্থে আমি অসুস্থতা থেকে কিছুদিন আগে মোটামুটি সুস্থ হলেও এ দায়িত্ব নিতে পারবো। দুজন প্রধান বিচাপতির মধ্যে বিচারপতি কেএম হাসানের পর ছিলেন বিচারপতি মাইনুর রেজা চৌধুরী। তিনি তখন মাত্র কিছুদিন আগে ইন্তেকাল করেছেন। আর দুজন সিনিয়ার বিচারপতির মধ্যে প্রথম ছিলের বিচারপতি এম এ আজিজ। যিনি সদ্য আপিল বিভাগ থেকে অবসর নিয়েছেন এবং প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন। অবশ্য আওয়ামী লীগ ও সমমনা দলগুলো তাকে মানছিল না। এমনকি প্রধান নির্বাচন কমিশনার হিসেবেও আপত্তি করছিল।

এরপর আসে বিচারপতি হামিদুল হকের নাম। তাকে বিএনপি সরকার বিচার প্রশিক্ষন ইন্সটিটিউটের চেয়ারম্যান করেছিলেন। অবসরের পর লাভজনক পদে অধিষ্ঠিত থাকা অযোগ্যতার মধ্যে পড়ে। তারপরও তিনি লিখিত দিয়েছিলেন এক পক্ষের আপত্তির কারণে তিনি প্রধান উপদেষ্টা হতে সম্মত নন। পঞ্চম অপশনে বিচারপতি মাহমুদুল আমিন চৌধুরী প্রসঙ্গ এসেছিলেন। মান্নান ভূঁইয়া তার জোটের পক্ষ থেকে আপত্তি করে বলেছিলেনকে এম হাসানের ব্যাপারে যে কারণে আপনাদের আপত্তি একই কারণে এখানে আপত্তি আছে। কে এম হাসানের দায়িত্ব গ্রহনের বিষয়টি নিদিষ্ট ছিল। আর পঞ্চম অনুযায়ী সকল দলের কাছে গ্রহনযোগ্য হলে মাহমুদুল আমিন হতে পারতেন। তথাপি জনাব চৌধুরীর সঙ্গে এব্যাপারে যোগাযোগ করলে তিনি বলেছিলেন কেবল সকল পক্ষ একমত হলেই আমি দায়িত্ব নেবো।

সমস্যা সমাধানে দুই নেত্রীকে একসঙ্গে বসাতে চেয়েছলাম। প্রধান নির্বাচন কমিশনারকে কিভাবে ছুটিতে পাঠানো হলো- ইত্যাদি ঘটনা বণনা করা যাবে। তবে আমাদের আমলে আমরা কিভাবে সমাধান করেছি বিশেষ করে নির্বাচনে সকল দলকে আনা পর্যন্ত এসব বলতে আমি রাজি হয়েছি। নির্দোষ বিষয় প্রকাশ করতে অসুবিধা নেই। তবে অনেক মিডিয়ার অনুরোধ উপরোধ উপেক্ষা করতে পারলেও পারিনি জনাব মতিউর রহমান চৌধুরীর উপর্যুপরি আন্তরিক অনুরোধ ফেলে দিতে। তবে একট জায়গায় আমরা একগ্রত হয়েছি যে, আমরা গত অসমাপ্ত নিবাচন পযন্তই থাাকবো। সে সময় পর্যন্ত গুরুত্বপূর্ন সুন্দর ঘটনাগুলো তুলে ধরার উদ্দেশ্যেই এই আয়োজন। সারা জীবন সততার সঙ্গে আমার দায়িত্ব পালনের ঘটনাবলী যারা আমাকে কাছে থেকে দেখেছেন তাদের কাছে নতুন করে বলার নেই। প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব থাকাকালে আল্লাহর অসীম রহমতে বঙ্গবভনের শতবর্ষ ও Hundred Years of Bangabhaban নামে দুটি বই প্রকাশ, প্রেসিডেন্টের অসুস্থতাকালে তার মুখপাত্র হিসেবে প্রেস ফেস করা এবং সবোপরি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে ঐতিহাসিক মুহুর্তে দায়িত্ব পালনের স্মৃতিময় ঘটনাগুলো সম্পর্কে এ দেশের মানুষের জানার আগ্রহ, কৌতুহল এবং সবচেয়ে বড় কথা এ ব্যাপারে জনগনের জানার অধিকারটি আমার আছে গুরুত্বপূর্ণ। এ দেশে প্রেসিডেন্ট বল ক্লিনটনের সফর ও ব্রিগেডয়ার জেনারেল শাবাব আশফাক হত্যা - ইত্যাদি ঘটনার সময় সাংবাদিক হিসেবে আমার দায়িত্ব পালনের স্মৃতির ঘটনা অনেকে জানেন।

আমি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা থেকে পদত্যাগ করার পর একটি পত্রিকায় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে বেশকিছু নিয়োগ, রদবদল ইত্যাদি নিয়ে লেখা হয় এবং যেখানে এসব ঘটনার জন্য আমাকে দায়ী করা হয়। কিন্তু এসব ঘটনা দেখে আমি অবাক ও বিস্মিত হই। শিক্ষা মন্ত্রণালয়সহ সংশ্লিষ্ট অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের সকলেই হেসেছেন। পরে এগুলোর তদন্ত হয়েছে। আমি পত্রিকাটির সম্পাদকের সঙ্গে কথা বললে তিনি অনুযোগের সূরে বলেন, চার-পাঁচদিন নাকি তিনি আমাকে ফোন করেছেন এবং কথা বলতে পারেন নি। এ জন্য এটি লেখা হয়েছে। আমি বললাম সত্য-মথ্যা যাচাই করে নিলে তো পারতেন।

সাংবাদিকতার নীতিমালা অনুযায়ী সংবাদে আক্রান্ত ব্যক্তির বক্তব্য নেয়া তো বাধ্যতামূলক। এক পত্রিকায় মোখলেস চৌধুরী মিন্টো রোডের লাল বাড়িতে শিরোনামে নিউজ ছেপেছিল। মন্ত্রী বা উপদেষ্টা হিসেবে বরাদ্দপ্রাপ্ত বাড়িতে থাকা আমার কোন অপরাধ ছিল কিনা জানি না। আমি ওমরাহ হজ করে আসার কারণে মাথায় টুপি দিতে হয়েছিল। এই টুপি দেয়ার ছবিও বিকৃত করে একটি পত্রিকা ছেপেছিল। মন্ত্রী বা উপদেষ্টারা বিভিন্ন আবেদন সুপারিশ করেন। এমন একট বই সরবরাহের আবেদনে সুপারিশ করার কারণে ইচ্ছামতো লেখা হয়েছে। এডিসি ইউএনওরা জবাব দিয়ে বলেছেন, উপদে?ষ্টা এ ধরনের সুপারিশ করতে পারেন। তবে কোন হস্তক্ষেপ করেননি এবং দরখাস্তে কাজও হয়নি। আরেকট দরখাস্তে সুপারিশ করার জন্য অনেক তদন্ত হয়েছে। Honesty is the best policy, এমন জীবন তুমি করিবে গঠন, মরনে হাসিবে তুমি, কাঁদিবে ভুবন ইত্যাদি বানী ছোটবেলা থেকেই আমাকে ওই ভাবে গড়ে উঠতে ভূমিকা রেখেছে। টাকা পয়সার প্রতি আমার কখনোই কোন লোভ ছিল না। Simple living and light thinking এই নীতিমালা আমাকে জীবনের এই পর্যায়ে নিয়ে এসেছে। জীবনের একটি বড় অংশ ইতিমধ্য কাটিয়ে দিয়েছ। তবে আমার সততা নিয়ে শক্ররাও প্রশ্ন করতে পারবে না।

অনেক তদন্ত হওয়ায় আমি খুশি হয়েছি। আমি কেমন সংশ্লিষ্টদের তা জানা দরকার। আমি শক্ররও ক্ষতি করি না। কেবল বিশ্বাস করি, পরম করুনাময় আল্লাহ তা’আলা মঙ্গলের মধ্যে অমঙ্গল ও অমঙ্গলের মধ্যে মঙ্গল নিহিত রেখেছেন- যা আল্লাহই জানেন, আমরা জানি না। সব সময় মাটির সঙ্গে মিশে চলার চেষ্টা করেছি। মানুষের সেবা করার ব্রত নিয়ে কাজ করছ। সাংবাদিকতার নীতিমালার অনুযায়ী No rumour will be news এ কথাটি সংশ্লিষ্ট সকলকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছি। হিংসা-প্রতিহিংসা, মানুষের ক্ষতি করা, কাউকে cut to size করা সাংবাদিকতার ধর্ম নয়। Journtlism এর পরিবর্তে অনেকে Sensationalism করেন। Black-mail করেন। এতে সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়। দেশ ও জাতির স্বার্থে Responsible Jaurnalism অত্যন্ত জরুরি।

 

বঙ্গভবনের সেই দিনগুলো -2

বিচারপতি কে এম হাসান প্রধান উপদেষ্টার দায়িত্ব পালনে অপারগতা প্রকাশের পর বিএনপি মহাসচিব ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদকের সংলাপের ফলাফল অনুযায়ী সঙ্কটের সমাধান হয়ে যাওয়ার কথা ছিল। কারণ দুই নেতা সংলাপ এই ইস্যুতেই শেষ করেছিলেন। হাসান না আজিজ এই দ্বিধাদ্বন্দ্ব শেষ পর্যন্ত হাসানের বিদায় ইস্যুতে যবনিকাপাত ঘটিয়েছিল। কিন্তু তখন আবার প্রধান নির্বাচন কমিশনার বিচারপতি এম এ আজিজের বিদায় ও অন্যান্য দাবি তোলা হয় নতুন করে।

আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে ১৪ দল নেতৃবৃন্দের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চাওয়া হলে যথারীতি তার ব্যবস্থা করে দিয়েছিলাম। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা এগ্রেসিভ বা আক্রমণাত্নক ভঙ্গীতে কথা বলছিলেন। কেউ কেউ প্রেসিডেন্টকে তাদের শ্রদ্ধেয় শিক্ষক, সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, বিশ্বের সবচেয়ে ক্ষমতাবান প্রেসিডেন্ট ইত্যাদি আখ্যা দিয়ে আবার টিপ্পনিও কাটছিলেন। শেখ হাসিনা আমাকে বলেছিলেন, তিনি শেষের দিকে প্রেসিডেন্ট ও আমাকে নিয়ে একান্তে কিছু সময় বসতে চান এবং এ ব্যবস্থাটা আমাকেই করে দিতে হবে। গণতন্ত্র ও সংবিধান সমন্নত রাখার স্বার্থে আমি এ প্রস্তাবে সম্মত হলাম। এর বিরোধিতা ছিল। এমনি একর্পায়ে আমি তাদের দু’জনকে বসিয়ে কিছু সময়ের জন্য বাইবে চলে আসি। এ উদ্যোগ ফলদায়ক ছিল। আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতার এ উদ্যোগটিকে ভালোভাবে নেনন। তাদের ৯ জনের একটি গ্রুপ দু’টি দেশের কাছে নেত্রীর বিরুদ্ধে লিখিত অভিযোগ দিয়ে রেখেছিলেন। শেখ হাসিনা নির্বাচনে অংশ নিতে চাচ্ছিলেন এবং এই গ্রুপটর কারণে পারছিলেন না। একান্ত আলোচনায় শেখ হাসিনা বলেছিলেন, দলের নেতারা অনেক দাবি জানাবেন। প্রেসিডেন্ট হিসেবে আপনি সিদ্ধান্ত দেবেন।

আপনি বিচারপতি আজিজকে পদত্যাগ করানোর চেষ্টা করবেন। সাংবধানিক পদ হিসেবে তিনি নিজে পদত্যাগ না করলে তো জোর করে করানো যাবে না- এটা আমিও বুঝি। সে ক্ষেত্রে তাকে ছুটিতে পাঠিয়ে হলেও নির্বাচনটা করুন। আমাদেরকে নির্বাচনে অংশ নিতে দিন। আমার দলেও আপনার অনেক ছাত্র আছে। তিন আরও বললেন, আমাদের পক্ষ থেকে বক্তৃতা বিবৃতি হবে। কর্মীদের ঠিক রাখতে হবে। আন্দোলনের অংশ হিসেবে আমরা নির্বাচনে অংশ নেবো। বিচারপতি আজিজের পক্ষেও আওয়ামী লীগে লবিং ছিল। বরিশাল অঞ্চলের নেতারা তার পক্ষে ছিলেন। কিন্তু কে এম হাসানের ব্যাপারে তাদের নেত্রীর পারসোনাল ইগো কাজ করছিল। সেটি হচ্ছে কর্ণেল ফারুক-রশীদদের সঙ্গে তার আত্নীয়তার কারণ। তাই হাসান ও আজিজের মধ্যে একজনকে বাদ দেয়ার প্রশ্ন যখন আসলো তখন স্বভাবতই হাসান মাইনাস হন। আওয়ামী লীগের একটি প্রভাবশালী অংশের মত ছিল একটি একটি ইস্যু ধরে এগোলে সরকারকে দূর্বল করা যাবে, যা নির্বাচনী বৈতরণী পার হতে সহায়তা করবে।

যাই হোক, শেখ হাসিনার কথা মতো আমি পরদিন সকালে প্রেসিডেন্টের রুম থেকেই সিইসি বিচারপতি এম এ আজিজকে রেড ফোনে ধরলাম। তাকে বললাম, দেশ ও জাতির স্বার্থে আপনাকে স্যাক্রিফাইস করতে হবে। সকল দলকে নিয়ে নির্বাচন করাই আমাদের লক্ষ্য। বিচারপতি আজিজ বললেন, আমি আমার সাংবিধানিক দায়িত্ব পালন করতে চাই। তিনি বললেন, নির্বাচন হওয়ার আগে‌ কি করে তারা আমার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুললেন। আমি তাকে বললাম, আপনার বক্তব্য কনটেস্ট করছি না। কিন্তু এখানে সৃষ্টি হযেছে আস্থার সঙ্কট। নির্বাচনটা তো করতে হবে। তিনি বললেন, ঠিক আছে। আমি কোন অবস্থাতেই পদত্যাগ করবো না। এছাড়া কী করা যায় বলুন। আমি এ কথা লুফে নিয়ে বললাম, হ্যাঁ আমিও মাঝামাঝি একটি প্রস্তাব দিতে চাচ্ছিলাম। আপনি ছুটিতে গিয়ে আমাদেরকে একটি সুযোগ করে দিতে পারেন। তিনি বললেন, কিন্তু আমাকে অবশ্যই তখন সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এমেনিটিজ দিতে হবে। তাতেও রাজি হলাম। সিইসিকে কমনওয়েলথের একইট স্কলারশিপ এবং অন্তর্বর্তীকালীন তার ফুল ফ্যামিলিকে বিদেশে প্রভাইড করার প্রস্তাব দিলাম। বৃটিশ ডেলিগেশন আমাদের সঙ্গে দেখা করে এস্কলারশিপের ব্ল্যাসঙ্ক চেক দিয়েছিল। আমেরিকা, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, এমনকি জাতিসংঘও স্ট্যান্ডিং অফার দিয়ে রেখেছিল। কিন্তু তিনি তাকে সম্মত হলেন না। বললেন, আমি দেশেই থাকবো। আমার বাসা, সিকিউটিরি সব বহাল থাকতে হবে। তবে নির্বাজন শেষ হওয়ার কিছুদিন পর পর্যন্ত তিনি নির্বাচন কমিশন থেকে পুরোপুরি দূরে থাকতে অর্থাৎ ছুটিতে থাকতে সম্মত হন। দেশ ও জাতির স্বার্থে আলহামদুলিল্লাহ বলে মহামান্যের হাতে ফোন সেটটি দিই। প্রেসিডেন্ট তাকে জাতির ঐতিহাসিক মুহূর্তে এভাবে এগিয়ে আসার জন্য ধন্যবাদ দেন। এরপর বিচারপতি আজিজ আবার আমাকে চান।

কথা অনুযায়ী আমি আমার রুমে যাই বঙ্গভবনে আমার অফিস রুম এবং নির্বাচন কমিশনে সিইসি’র অফিস রুম বন্ধ করে দেয়া হয়। এরপর সাদা কাগজে বিচারপতি সাহেব প্রেসিডেন্টের উদ্দেশে ছুটির দরখাস্ত লিখেন। তাতে তিনি নির্বাচনকালীন সময়ে ছুটিতে থাকা, তার বাসায় অবস্থান এবং সকল সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এমেনিটিজ প্রদানের অনুরোধ ইত্যাদি জানান। তিনি আমার রুমে ফ্যাক্সে দরখাস্তটি পাঠিয়ে দেন। শেখ হাসিনা এ উদ্যোগ বাস্তবায়িত হতে দেখে খুশি হন। খালেদা জিয়াও বলেন, আর কোন দাবি-দাওয়া যেন না আসে। কারণ আমরা নিজেরাই তো বসে আরও কমে সঙ্কট সমাধান করে ফেলেছিলাম। সত্যি কথা বলতে কি, দু’টি প্রধান দলের মধ্যে সমঝোতা তখন বড় বেশি প্রয়োজন। কারণ খেলায় যারা খেলোয়াড় থাকবেন তাদের মধ্যে প্রতিযোগিতায় অংশ নেয়া ও তার ফলাফল মেনে নেয়া অর্থাৎ হেলদি কমপিটিশন না হলে রেফারির জন্য অসুবিধা হয়। কিন্তু আওয়ামী লীগের কয়েকজন নেতা রাজপথ গরম করার বক্তব্য দিতে থাকেন।

উপদেষ্টা এডভোকেট সুলাতান কামালকেও আমরা শেখ হাসিনার সঙ্গে কথা বলতে বলেছিলাম। কারণ আমরা চেয়েছিলাম যেখানে যার সুসম্পর্ক আছে সিটি কাজে লাগাতে হবে। সুলতানা কামালকে শেখ হাসিনা বলেছিলেন, বিচারপতি আজিজকে যে কোনভাবে ছুটিতে পাঠিয়ে হলেও সঙ্কটের সমাধান করতে হবে। এর বাইরে নির্বাচন কমিশনার স. ম. জাকারিয়াকে সরানোর জন্যও চেষ্টা করতে হবে। তবে বিচারপতি আজিজ ইস্যু সমাধানে অন্যথা করা যাবে না। এ বিষয়টি আমরা প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টা এবং উপদেষ্টা পরিষদে চুলচেরা বিশ্লেষণ করছিলাম। প্রেসিডেন্টের জাতির উদ্দেশে দেয়া ভাষনে সদ্য বিলুপ্ত সংসদে প্রতিনিধিত্বকারী প্রধান দলগুলোর কাছে উপদেষ্টাদের নাম চাওয়া হয়েছিল। সংসদীয় গণতান্ত্রিক বিধান অনুযায়ী ৩০টি আসন যাদের আছে তারা রাজনৈতিক দলের স্বীকৃতি পায়। আর দশটি আসন সংবলিত দলকে গ্রুপ বলা হয়। আমরা প্রেসিডেন্টের সঙ্গে সংলাপে গ্রুপ পর্যন্ত গিয়েছিলাম।

এমনকি উপদেষ্টাদের নাম নেয়ার সময়ও গ্রুপের বাইরে থেকেও নাম এসেছিল। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের সময় ১৯৯১ সালেও অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে এভাবেই নাম নেয়া হয়েছিল। রাজনৈতিক দল ছাড়াও সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন জায়গা থেকে যাদের নামে আপত্তি ছিল তাদের মধ্যে বেগম কামালের নামও ছিল। তখন আমরা সামরিক ও বেসামরিক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা যারা প্রেসিডেন্টের কাছে ছিলাম আমরা চেয়েছি যেহেতু নাম চাওয়া হয়েছে সে জন্য উপদেষ্টা পরিষদে সংশ্লিষ্ট প্রধান দলগুলোর প্রতিনিধি থাকতে হবে। অন্য অনেকের ব্যাপারে সুনির্দিষ্টভাবে আপত্তি ছিল। সুলতানা কামালকে ব্যালান্স করার জন্য নেয়ার পক্ষে জোর দিয়েছিলাম। অবশ্য তিনি সমঝোতার পক্ষে কাজ করছিলেন। বঙ্গভবনে কাজের ফাঁকে একরাতে প্রেসিডেন্টের সঙ্গে আমরা সব উপদেষ্টারা যখন ডিনারে ছিলাম তখন সুলতানা কামাল ও তার স্বামী মি. চক্রবর্তী আমার পাশে ছিলেন। সুলতানা কামাল সেখানে ও উপদেষ্টা পরিষদের কয়েকটি বৈঠকে আমাকে বলছিলেন আপনি যেভাবে এখানে রাত-দিন সমঝোতার জন্য কাজ করছেন বাইরে কিন্তু আপনার সম্পর্কে অন্য রকম ধারণা দেয়া হয়েছে। একসঙ্গে কাজ না করলে আমরা বুঝতাম না। দিন-রাত আমি বঙ্গভবনে এমনই ব্যস্ত ছিলাম যে, স্ত্রী-পরিবারের কথা ভুলেই গিয়েছিলাম। বৈঠক, অন্যান্য প্রোগ্রাম, প্রেস ব্রিফিং করা ইত্যাদি কারণে সন্ত্রীক বৈঠকগুলোতেও স্ত্রীকে নিয়ে যেতে পারিনি। উপদেষ্টারা কিভাবে অন্তর্ভূক্ত হয়েছিলেন এবং সেখানে কিভাবে বিভিন্ন দলগুলোর সঙ্গে ভারসাম্য বজায় রেখে তাদেরকে নেয়া হয়েছিল তারা এ ব্যাপারে ভালই জানেন।

ড. আকবর আলী খান, মাহবুবুল আলমসহ উপদেষ্টারা দেখেছেন কিভাবে তাদের সিনিয়রিটি নির্ধারণ করেছি। সবাইকে বঙ্গভবনের এক নম্বর ভিআইপি কল অন রুমে বসিয়ে প্রত্যেকের অবস্থান ইতাদি নিয়ে আলাদা আলাদা আলাপ করে সিরিয়াল ঠিক করেছিলাম। সামরিক ও বেসামরিক কর্মকর্তাদের নামের সমন্বয়েও সমস্যা হচ্ছিল। অনেকে পেছন থেকে কথা বলতেন। সামনে বিড়ালের গলায় কেউ ঘন্টা বাঁধতে চাইতেন না। ক্যাবিনেট সেক্রেটারি থাকার কারণে আকবর আলী খানের অবস্থানটি নির্ধারণ করার পর অবসরপ্রাপ্ত সেনা লেঃ জেঃ হাসান মশহুর চৌধুরীর অবস্থান দ্বিতীয় করতে গেলে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব সিএম শফি সামী মুখ্য পররাষ্ট্র সচিব থাকার প্রসঙ্গ তোলা হয় এবং বলা হয় মুখ্য পররাষ্ট্র সচিবের অবস্থান কেবিনেট সেক্রেপারি বা মন্ত্রিপরিষদ সচিবের সমপর্যায়ের সেনাবাহিনীর বিভিন্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের আপত্তি এবং ওয়ারেন্ট অব প্রিসিডেন্ট দেখে দুদক নম্বরে জেনারেল মশহুদ ও ৩ নম্বরে সিএম শর্মা সামীকে অবস্থান দেয়া হয়। এরপর কে কবে স্ব পদে এলেন এবং কে কি হিসেবে অবসরে গেলেন, সরকারি-বেসরকারি অবস্থান ইত্যাদি দেখে তাদের সিরিয়াল করে দেয়ার অপ্রিয় কাজটি নিয়মতান্ত্রিকভাবে করি। অবশ্য সুষ্ঠুভাবে এটি করার কারণে খুশি হয়েছিলেন।

বিচারপতি আজিজ ছুটিতে গেলে আবার স. ম. জাকারিয়া ইস্যু আনা হলো। বিভিন্ন মহল থেকে এটিকে দেখা হলো ওয়াদার বরখেলাপ হিসেবে। আওয়ামী লীগ থেকে চাপ দেয়া হচ্ছে আমাদের ওপর। রাস্তায় হরতাল-অবরোধ চালানো হচ্ছে। উপদেষ্টা পরিষদ বসছে ঘন ঘন। চট্টগ্রাম বন্দর বন্ধ রাখা ও সারাদেশকে অবরোধ করে রাখার সেই দুঃসহ পরিস্থিতিতে এক-দু’দিন পর পর আইন-শৃঙ্কলা কমিটির বৈঠকও করা হচ্ছে। ২০০৭ সালের সেই ১১ই জানুয়ারি জরুরি অবস্থা জারির আগ পর্যন্তও প্রেসিডেন্টসহ আমরা সবাই ল’অ্যান্ড অর্ডার মিটিংয়েই ছিলাম। আওয়ামী লীগ তথা মহাজোটকে নির্বাচনে আনার জন প্রেসিডেন্ট ও প্রধান উপদেষ্টার সভাপতিত্বে বঙ্গভবনে বৈঠকে আমরা স. ম. জাকারিয়া ইস্যু নিয়ে আলাপ করছিলাম। ওই বৈঠকে সুস্পষ্টভাবে আমার ও সুলতানা কামালের একই রকমের বক্তব্য ছিল। আর তা হলো শেখ হাসিনা স. ম. জাকারিয়া ইস্যু ছাড়াই মেনেছিলেন। কিন্তু এখন দলের কয়েকজন নেতার কারণে সমস্যায় পড়েছেন বলে জানিয়েছেন। 

 

বঙ্গভবনের সেই দিনগুলো-৩

আসলে জনাব জাকারিয়ার বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানে ছিলেন তোফায়েল আহম্মেদ। পূর্ববর্তী নির্বাচনে তার পরাজ্য় হচ্ছে এর মূল কারণ। অথচ আমরা দেখেছি স�ম� জাকারিয়ার সঙ্গে জনাব তোফায়েলের এক সময়ে কি সুসম্পর্ক। একই সঙ্গে সরকারী কর্মকর্তাদের ট্রান্সফার, পোস্টিং ইত্যাদি নিয়েও আমাদের উপর চাপ ছিল। প্রেসিডেন্ট নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান উপদেষ্টা শপথ গ্রহনের পরেই প্রসাশনের হাতেগোনা কয়েকটি পদ ছাড়া ঢালাওভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয়। বিদেশে বাংলাদেশের মিশনগুলোতে কর্মরত প্রেস মিনিস্টারেরাও এথেকে বাদ যাননি। সিকিউরিটি এন্ড একচেঞ্জ কমিশনের (এসইসি) চুক্তিভিত্তিক উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের চুক্তি পর্যন্ত বাতিল করা হয়। পরে কাজ চালিয়ে যেতে সমস্যা হওয়ার কথা উল্লেখ করে বিভিন্ন মহল থেকে এসইসির সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে বলা হয়। বিষয়টি পরের দিন সেভাবে সংশোধিত হয়। দিল্লি ও লন্ডনে বাংলাদেশ হাইকমিশনে মিনিস্টার প্রেস পদে চুক্তি ভিত্তিক নিয়োজিত কর্মকর্তাদের চুক্তি বাতিলের বিষয়টিও সরকারী নিয়োগ পদোন্নতি ও বদলী সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির গোচরে আনা হয়েছিল। এতে যুক্তি ছিল আগের সরকাগুলোর আমলে এসব পদে দলীয় সরকারের চুক্তিভিত্তিক কর্মকর্তারা বহাল ছিলেন। দিল্লিতে ফারুক কাজী, লন্ডনে এএমএম হাসান ও ওয়াশিংটনে আবুল কালাম আজাদকে আওয়ামীলীগ সরকার নিয়োগ দিলেও তত্ত্বাবধায়ক সরকার পেরিয়ে বিএনপি সরকার আসার পরেও বেশকিছুদিন তারা বহাল ছিলেন। আর আমাদের সময় দিল্লিতে আনোয়ারুল হক ও লন্ডনে এম কামাল কিছুদিন সময় চাইলেও তা দেওয়া হয়নি। কারণ ছিল ওই সরকারের নিরেপেক্ষতা প্রমান করা। অবশ্য বিএনপি সরকারের আর এক চুক্তিভিত্তিক মিনিস্টার প্রেস গোলাম আরশাদ (ওয়াশিংটন), যিনি ইনকিলাব সম্পাদক এএমএম বাহাউদ্দিনের ভগ্নিপতি, তার চুক্তি মেয়াদ শেষ হয়। আমাদের সময় নির্দলীয় তত্ত্বধায়ক সরকারের সময় যেভাবে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিল করা হয় তা ছিল এদেশের নির্বাচন কালীন সরকারের ইতিহাসে বিরল। সুরঞ্জিত সেন গুপ্ত মিটিংগুলোতে বলতেন আগের তত্ত্বাবধায়ক সরকারগুলোর আমলে নাকি এক কলমের খোচায় সব চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বালি করা হয়েছিল। এধরণের মিথ্যা তথ্য মিটিং -এর মধ্যে হাস্যরসের জন্ম দিয়েছিল। কর্মকর্তারা হতবাক হন। যেভাবে উর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের বদলি এবং পদায়ন করা হচ্ছিল তাতে বিএনপি নেতৃবৃন্দ ক্ষুব্ধ হচ্ছিলেন। কিন্তু নিরেপেক্ষ নির্বাচন এবং লেভেল প্লেয়িং ফিল্ডের স্বার্থে সেসব করা হচ্ছিল। উপদেষ্টা এবং নির্বাচন কমিশনের সদস্য পদে আওয়ামীলীগ এবং বিএনপি বিভিন্ন নাম দিচ্ছিল। সদ্য বিদায়ী সরকারের আমলে চুক্তিভিত্তিক সচিব বা সমমানের কর্মকর্তাদের নামও এসব তালিকায় ছিল। আওয়ামীলীগের আপত্তির কারণে বিএনপির তালিকার এসব নাম বাদ দিচ্ছিলাম। আবার সচিবের চেয়ে নিম্ন পর্যায়ের কর্মকর্তাদের নামও আওয়ামীলীগ থেকে এসেছিল। কিন্তু সচিবের নিচে আমরা যেতে চাইনি। এসব পদের নামগুলো আলোচনা এ মূহুর্তে বিষয় নয়। আওয়ামীলীগের চাপে স�ম� জাকারিয়াকে বাদ দেয়ার ইস্যুর সঙ্গে নতুন নির্বাচন কমিশনার নিয়োগের দাবী না আসলে হয়ত নতুন কেউ অন্তর্ভুক্ত হতেন না। উপদেষ্টা পদের নাম নেয়ার পর সমস্যা দেখা দেয়ায় নির্বাচন কমিশনার পদে নতুন নাম না নেয়ার কথাই আলোচনায় আসে। সরকারের বিভিন্ন এজেন্সি থেকে নাম যাচাই বাছাই করা হয়। কিন্তু সমস্যার পর সমস্যা তৈরী হয়। এরপরও নির্বাচনে মহাজোটকে আনা হয়েছিল। নির্বাচন কমিশানর স�ম� জাকারিয়াকেও আওয়ামীলীগের কথায় সিইসির কায়দায় সরানো হয়েছিল। ব্যরিস্টার রোকনউদ্দিন মাহমুদসহ একটি প্রতিনিধি দল একরাতে বঙ্গভবনে এসেছিলেন। রোকনউদ্দিন মাহমুদ ইচ্ছাকৃতভাবে প্রেসিডেন্টকে ধরিয়ে দিয়ে বললেন সিইসি যে রিজাইন করলেন তাতে ভালোই হয়েছে। প্রেসিডেন্ট বললেন হ্যা আমরা তো সমস্যা সমাধান করছি গণতন্ত্রের জন্য। আমি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হিসেবে রোকনউদ্দিনের বক্তব্য তাৎক্ষনিকভাবে সংশোধন করে বললাম সিইসি রিজাইন করেননি, ছুটিতে গেছেন। আসাদুজ্জামাজন নূর সেখানে ছিলেন। বাইরে এসে মাহমুদ বললেন, প্রেসিডেন্ট বললেন সিইসি রিজাইন করেছেন। আর প্রেসিডেন্টের অ্যাডভাইজার জানালেন যে, সিইসি ছুটিতে গেছেন ইত্যাদি। সিনিয়র কর্মকর্তারা বললেন, স্যার এই লোকটি বেগম জিয়ার সর্বশেষ প্রধানমন্ত্রীত্বকালে মইনুল রোডের বাসায় গিয়ে দু’বার দেখা করে। মন্ত্রীত্ব ও ফটিকছড়ি থেকে এমপি হতে চেয়েছিলেন। দেখবেন স্যার এখন যেভাবে তিনি আওয়ামীলীগ করছেন ভবিষ্যতে দুঃসময়ে তিনি তাদের কাছে থাকবেননা। মোর ক্যাথলিক দ্যান দা পোপ এর মতো মোকাম্মেল হক আমাদের কেয়ারটেকার সরকারের হঠাৎ অনেকটা বিপ্লবী ভূমিকায় অবতীর্ণ হন। সরকারী কর্মকর্তাদের ঢালাওভাবে বদলী ও একশন নেওয়ার দাবী তার। প্রশাসনে একটি বিশৃঙ্খল পরিস্থিতি তৈরী হবে এসব করলে - এমন বক্তব্য ছিল তারই দলের অন্যদের। ভোলার সন্তান তোফায়েল ও মোকাম্মেল অনেকটা পাল্লা দিয়ে চলেছিলেন। মোকাম্মেলের সঙ্গে আমি কমনওয়েলথ সোসাইটি অব বাংলাদেশ- এ জড়িত। তিনি মাত্র কিছুদিন আগেও আওয়ামীলীগের হিসেবে নিজেকে স্বীকার করছিলেন না। হোসেন মুহম্মদ এরশাদের সময় জি-টেন এর মেম্বার জনাব হককে তার প্রতিদ্বন্দ্বীরা পারিবারিকভাবে রাজাকার বলেও তিনি আওয়ামীলীগের সর্বশেষ সরকারের নিয়োগকৃত বিনিয়োগ বোডের চেয়ারম্যান ছিলেন। ঐ সময় তোফায়েল আহম্মেদের সঙ্গে তার পাল্লা দিয়ে নানা ঘটনা সৃষ্টির বিষয় পত্রপত্রিকায় শিরোনাম হয়। জরুরী অবস্থা জারীর পর সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দেশে একদিনের জন্য প্রেস সেন্সরশীপ আরোপ করে। দু’ একটি পত্রিকা এজন্য আমাকে দায়ী করে, যা সংশ্লিষ্টদের মাঝে হাসি-তামাশার জন্ম দিয়েছিল। জরুরী অবস্থা যারা জারী করেছে তারাই কারফিউ এবং এই প্রেস সেন্সরশীপ আরোপ করেছিল। অথচ ইচ্ছাকৃতভাবে এটা করে প্রেসিডেন্টকে জানিয়ে আবার বিশেষ কলামও লেখা হয়েছিল। আমি এর জবাব দিয়েছিলাম। এরপরও আরেকজন উপসম্পদক একমাস পরে টিভি চ্যানেলে টকশোতে এজন্য আমাকে টেনে এনেছিলেন। আর একজন সম্পাদক আশির দশকে আমি যখন একটি দৈনিকের চিফ রিপোর্টার, তখন তিনি ছাত্র থাকার কথা মনে না করে সম্পাদক হয়ে যাওয়ার কারণে নিজেকে সিনিয়র দাবি করে অনেক কিছুই লিখবেন। কিছু মিডিয়া সিন্ডিকেটেড ওয়েতে সত্যমিথ্যা যাচাই না করে পাপ্পারাজির মত ছূটে বেড়িয়েছে। ইস্যুর পর ইস্যু তৈরী করেছে। ফলে দ্বায়িত্বশীল সাংবাদিকতা ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে। অপপ্রচারের কারণে বৈঠককালে আমাকে মোবাইল ফোন বাইরে রেখে আসতে হয়। এটি অবশ্য অন্য সময় বলা যাবে।

দেশে ভবিষ্যতে নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি হবেনা - এমন নিশ্চয়তা সংশ্লিষ্ট সকলের কাছ থেকে আসতে হবে। আমাদের দেশে রাজনীতি, সেনাবাহিনী, চাকুরীজীবি, সাংবাদিকতা, ব্যবসায়ী, কৃষক ও অন্যান্য পেশাজীবি সকলের মধ্যে ভাল খারাপ দুই ধরনের লোকজনই রয়েছে। আমাদের সকলকে আল্লাহ তাআলা তথা সৃষ্টিকর্তার কাছে জবাবদিহি করতে হয়। বলা হয় পাওয়ার করাপ্টস অ্যান্ড এবসলিউট পাওয়ার করাপ্টস এবসলিউটলি। এবিষয়টি মনে রেখে যারা দূর্নীতির উর্ধ্বে উঠে কাজ করতে পারে তারাই সফল। ওকাবের প্রেসিডেন্ট থেকে শেষ পর্যায়ে আমি দেশের প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব ও পরে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা হয়ে আমাদের দেশপ্রেমিক রাজনীতিক, সেনাবাহিনী, ব্যুরেক্রেসি ও সিভিল সোসাইটিকে কাছে থেকে দেখেছি। কিছু সংখ্যক লোক ছাড়া সবাই দেশপ্রেমিক এটি হচ্ছে ফাইন্ডিংস। দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, ড� মঈন খান ও একজন পুলিশ আমার বঙ্গভবন ছেড়ে আসার পর বললেন আপনার কিছু সংখ্যক কলিগই আপনার সঙ্গে শত্রুতা করেছে। বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা আমি দ্বায়িত্ব পালন করেছি ৬৪ দিন। আর এর আগে প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব ছিলাম ৭শ’ ৯ দিন। প্রেসিডেন্টের সঙ্গে রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্বে এ হিসেবে মোট ৭শ’ ৭৩ দিন আমাকে বঙ্গভবনে কাজ করতে হয়েছে। প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা তথা প্রতিমন্ত্রির দ্বায়িত্ব পালন কালে প্রেসিডেন্টকে সার্বিক বিষয়ে সহযোগীতা করা ছিল আমার দ্বায়িত্ব। তখন প্রেসিডেন্ট কেবল রাষ্ট্রপ্রধানই নন সরকার প্রধানও, প্রধান উপদেষ্টা বা প্রধান মন্ত্রীর দ্বায়িত্বও তার উপর ন্যাস্ত। নির্দলীয় তত্ত্ববধায়ক সরকারের সময় প্রধান উপদেষ্টা বা সরকার প্রধানের বিষয়ে সংবিধানের মোট ৬টি অপশনের মধ্যে পাঁচটি অপশন শেষ হয়ে গেলে ষষ্ঠ তথা সর্বশেষ অপশনে প্রেসিডেন্ট নিজেই প্রধান উপদেষ্টার দ্বায়িত্ব গ্রহন করবেন বলে সুস্পস্ট বিধান রয়েছে। জাতীয় সংসদে ১৯৯৬ সালে সংবিধান করে তত্ত্বাবধায়ক সরাকারের যে চালুর বিধান করা হয় তাতে প্রেসিডেন্টের উপর এই অতিরিক্ত দ্বায়িত্ব প্রদান করা হলেও আগের দু’বার অর্থাৎ ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সালের তত্ত্বাবধায়ক সরাকারের সময় এ সংক্রান্ত অপশন কাজ করেছিল বলে প্রেসিডেন্ট পর্যন্ত আসতে হয়। বিচার পতিদের চাকুরীর বয়স বাড়ানোর কারণে আওয়ামীলীগ বিচারপতি কে এম হাসানকে প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে বর্জন করার কথা উল্লেছিল। অপরদিকে বিএনপির বক্তব্যে বিচারপতি কে এম হাসান, বিচারপতি সৈয়দ জে আর মোদাচ্ছির হোসনকে আওয়ামীলীগ সরকার সুপারসিড অবস্থান তথৈবচ ছিল। 

 

বঙ্গভবনের সেই দিনগুলো - ৪

দীর্ঘ সময় বঙ্গভবনের সরকারি লোকজন প্রেস সচিবের পদে দায়িত্ব পালন করার পর বাইরে থেকে হঠাত আমাকে প্রেস সচিব নিযুক্ত করায় অনেকের শোন দৃষ্টি পড়েছিল আমার ওপর। সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্য থেকে যোগ্যতা সম্পন্নদের বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ প্রদানের অংশ হিসেবে যাদেরই নিয়োগ দেয়া হয় আমলারা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন না বলে শুনেছি। প্রেসিডেন্ট অফিসে একজন সচিব, যিনি আগের দিন যোগ দিলেন, পরদিনই তার চুক্তি বাতিল করার ঘটনাও ঘটেছে।

২০০৬ সালের ৩০শে অক্টোবর প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ের সচিব হলেন আখতার হোসেন খান। পরদিন ৩১শে অক্টোবরই তার চুক্তি বাতিল করতে হয়। তিনি ৩ বছরের জন্য চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ পাওয়ার আগে সরকারের সচিবই ছিলেন। আওয়ামী লীগসহ বিভিন্ন দল সরকারের চুক্তিভিত্তিক নিয়োগসমূহ বাতিলের দাবি জানালে তিনি যেখানে থাকতেন সেখানেই তার চুক্তি বাতিল হতো। কিন্তু প্রেসিডেন্ট কার্যালয়ে তিনি চুক্তিভিত্তিক অবস্থায় যোগ দেয়ায় সকলের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হন। তাই বুঝি উল্লিখিত রাজনৈতিক দলগুলো তার নাম উল্লেখ করে লিখিতভাবে এবং প্রেসিডেন্টের সামনে বক্তৃতা দিয়ে তার চুক্তি বিশেষভাবে বাতিল দাবি করে। এর আগে পরিকল্পনা কমিশনে তিনি চুক্তিভিত্তিক সচিব ছিলেন। তার নাম উল্লেখ করার সময় ১৪ দল নেতৃবৃন্দ সাদা চুলওয়ালা পর্যন্ত উল্লেখ করেছিলেন বোঝানোর জন্য। তিনি যথারীতি ৩০শে অক্টোবর ২০০৬ যোগ দেন এবং ৩১শে অক্টোবর রাতে বঙ্গভবনে সরকারি নিয়োগ, বদলি ও পদোন্নতি সংক্রান্ত উপদেষ্টা কমিটির বৈঠকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ বাতিলের সময় তিনিও তাতে অন্তর্ভূক্ত হন। ফলে মাত্র দু’দিনের স্বল্পতম সময়ের জন্য তিনি বঙ্গভবনে সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করতে সক্ষম হন।

আমি যখন বঙ্গভবনে প্রেসিডেন্টের প্রেসসচিব হিসেবে যোগ দেই তখন সেখানে ভারপ্রাপ্ত সচিব ছিলেন মো আবু সোলায়মান চৌধুরী। তিনি ২০০৪ সালের ১১ই আগষ্ট এ পদে যোগ দেন। ১৫ই ফেব্রুয়ারী ২০০৫ তারিখে তিনি সচিব হন এবং প্রেসিডেন্টের সচিব হিসেবেই দায়িত্ব পালন করেন। তিনি বিসিএস ৭৩ ব্যাচের মুক্তিযোদ্ধা অফিসার। এর পর ৩০-১১-২০০৫ তারিখে প্রেসিডেন্টের সচিব হিসেবে আসেন কামালউদ্দিন আহমেদ ও ৩১-০১-২০০৬ পর্যন্ত দায়িত্ব পালন করেন। ০১-০২-২০০৬ তারিখে এ পদে যোগ দেন সচিব আবু মো মনিরুজ্জামান খান ও ১৮-০৬-২০০৬ পর্যন্ত প্রেসিডেন্টের সচিবের দায়িত্ব পালন করেন এএফএম সোলায়মান চৌধুরী। জাফর আহমেদ চৌধুরী ১৮-০৯-০৬ থেকে ৪১-১০-০৬ এবং ইসমাইল জবিউল্লাহ ০১-১১-০৬ থেকে ০৮-১১-০৬ তারিখে প্রেসিডেন্টের সচিব হিসেবে যোগ দেন মো• সিরাজুল ইসলাম। উল্লেখিত সচিবদের মধ্যে আখতার হোসেন খান ১৯৭৪ সালে সরকারি চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন এবং ইসমাইল জবিউল্লাহ বিসিএস ১৯৭৭ ব্যাচের কর্মকর্তা। বাদবাকি সবাই ১৯৭৯ ব্যাচের। আমার দায়িত্বকালে এই ৮জন সচিবের সঙ্গে সহকর্মী হিসেবে কাজ করেছি। আখতার হোসেন খানের ক্ষেত্রে যেমন সংক্ষিপ্ততম সময় সচিবের দায়িত্ব পালন অর্থাত আগের দিন বঙ্গভবনে যোগ দিয়ে পরদিনই চুক্তি বাতিল হওয়ার কারণে বঙ্গভবন ত্যাগ করে তার আর ফিরে আসার ঘটনা ঘটেনি, তেমনি ইসমাইল জবিউল্লাহর বেলায় মাত্র ৯ দিন দায়িত্ব পালনের ঘটনা ঘটেছে।

আমি সব সময় মজলুমদের পাশে অবস্থান নেই। বঙ্গভবনে ইসমাইল জবিউল্লাহ সচিব হিসেবে যোগ দিতে পারছিলেন না। তার যোগদানপত্রও গৃহীত হচ্ছিলো না। কিন্তু তিনি ফাইল স্বাক্ষর করে যাচ্ছিলেন। প্রেসিডেন্টকে না জানিয়েই এই নিয়োগ দেয়া হয়েছিল। অন্যদিকে তখন প্রেসিডেন্টের বিভিন্ন প্রোগ্রামেও তিনি যোগ দিচ্ছিলেন। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো ততপর ছিল। তার বিরুদ্ধে দুর্নীতি অভিযোগ ছিল। তখন সিদ্ধান্ত হলো তাকে অন্য কোন মন্ত্রণালয়ে বদলি করা হবে। বেচারা আমাকে ধরলেন। ইআরডিতে তিনি ছিলেন। সেখানে যেতে বলা হলে তিনি সেখানে যেতে চাচ্ছিলেন না। ভাল মন্ত্রণালয় চাইলেন। যোগাযোগ দেয়া হলো। তিনি বললেন, চলেই তো যাচ্ছি। কিন্তু এখন আমি যে ক‘দিন বঙ্গভবনে কাজ করলাম তার জয়েনিং রিপোর্ট যদি মহামান্য একসেপ্ট না করেন তাহলে পরে আমার এই ক‘দিনের চাকরি তো সমস্যা হবে। একটি গ্যাপ বা ভ্যাকুয়াম হবে। তখন তাকে প্রেসিডেন্টের কাছে নিয়ে গিয়ে তার এই সমস্যাটি বুঝিয়ে মহামান্যকে দিয়ে ওই জয়েনিংটা একসেপ্ট করিয়ে দিলাম।

কিন্তু এ সমস্যার এখানে শেষ নয়। ততকালীন যোগাযোগ উপদেষ্টা লে জেনারেল হাসান মশহুদ চৌধুরী (অব) তাকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয়ে নিতে রাজি নন। জবিউল্লাহ বিষয়টি জানালেন। প্রেসিডেন্টকে জানানো হলো। প্রেসিডেন্ট জেনারেল চৌধুরীর সঙ্গে উপদেষ্টা পরিষদের নিয়মিত বৈঠক শেষে এ বিষয়ে কথা বললেন। যোগাযোগ মন্ত্রণারয়ের উপদেষ্টা হাসান মশহুদ চৌধুরী প্রেসিডেন্টকে বললেন, স্যার, আমার কাছে থেকে আপনি যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নিয়ে নেন। তাকে আমি নিতে পারবো না। সরকারের কোন কোন মহল জেনারেল মশহুদের কাছ থেকে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় নিয়ে নিতে বললেন। আমি বঙ্গভবনে আরেক দিন আমাদের নিত্যদিনের মিটিং শেষে জেনারেল চৌধুরীকে বললাম মহামান্যের এই সিদ্ধান্তটির প্রতি সম্মান দেখানো দরকার। পরে প্রয়োজনবোধে সচিবকে পরিবর্তন করা যাবে এবং আপনার এ কারণে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় ছাড়ার দরকার নেই। কোন অভিযোগ থাকলে সেজন্য আইন রয়েছে। জেনারেল রাজি হলেন আর বললেন, ওই সচিবের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ আছে। এজন্য আমি তাকে নিতে চাইনি। ঠিক আছে, তাকে আমার কাছে পাঠিয়ে দেবেন। আর আমি যোগাযোগ মন্ত্রণালয়েও পুনরায় যাবো। এভাবে বিষয়টির সুরাহা হয়ে গেলে আমরা স্বস্তি পেলাম।

বঙ্গভবনে দু‘টি বিভাগ বা ডিভিশন রয়েছে। একটি পাবলিক ডিভিশন বা জনবিভাগ ও অপরটি পার্সোনাল ডিভিশন বা আপন বিভাগ। ইতিপূর্বে বঙ্গভবনে আপন বিভাগে বিভিন্ন পদে লোক নিয়োগের একটি ফাইল দীর্ঘদিন প্রেসিডেন্ট সিদ্ধান্ত না দিয়ে পেইন্ডিং রেখেছিলেন। প্রেসিডেন্টের কাছে অভিযোগ ছিল স্বচ্ছতার সঙ্গে এসব নিয়োগ দেয়া হয়নি। বঙ্গভবনের মুয়াজ্জিন হিসেবে যিনি দীর্ঘদিন ধরে কাজ করছিলেন তার নিয়োগও এ প্রক্রিয়ায় আটকা পড়েছিল। ইমাম সাহেবের ছেলে মুয়াজ্জিনের বিষয়টি আমরা সবাই আলাদাভাবে সহানুভুতির দৃষ্টিতে দেখছিলাম। তাদের বাড়িও মুন্সীগঞ্জে। প্রেসিডেন্ট তাদের প্রতি সঙ্গতকারণেই দুর্বল ছিলেন। উল্লিখিত অভিযোগের কারণে প্রেসিডেন্ট কেবল মুয়াজ্জিনের নিয়োগ দেয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। এ জন্য কয়েকবার ফাইল কল করা হয়েছিল। কিন্তু সংশ্লিষ্টরা জানালেন যে, এ প্রক্রিয়ায় নিয়োগ দিতে হলে সবাইকে দিতে হবে। আলাদাভাবে একজন করে দেয়ার সুযোগ নেই। ইমাম সাহেব বঙ্গভবন জামে মসজিদের জুমার নামাজে দেখা হলে এবং আমার রুমে এসে বিভিন্ন সময়ে বিষয়টি তুলে ধরলে বিব্রত হতাম। কারণ তার বিষয়টি ছিল যৌক্তিক এবং তাদের প্রতি আমার সম্মান ও সহানুভুতি ছিল। মহামান্যের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে কয়েকবার আলাপ করেছি। তিনি পুরো ফাইলটিতে অনিয়ম ও অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত হয়ে গেছে বলে উল্লেখ করায় এ বিষয়ে প্রথমদিকে আমি আর আগাইনি। কারণ আমি নিয়মের মধ্যে থেকে সব বিষয় নিষ্পত্তির পক্ষে। প্রেসিডেন্টের সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এএনএম মুনীরুজ্জামান অনেকবার এ বিষয়টি আলোকপাত করেন। তিনি বলেন, একটি নিয়োগ প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে এগুলো চুড়ান্ত করা হয়েছে। পিএসসি’র প্রতিনিধির স্বাক্ষর না থাকার যে বিষয়টি আমাকে জানানো হয়েছে সে সম্পর্কে তাকে জিজ্ঞেস করলে তিনি জবাবে জানিয়েছিলেন, মেজরিটির স্বাক্ষর ফাইলে রয়েছে। প্রত্যেকের উপস্থিতি ও স্বাক্ষর ম্যান্ডেটরি নয়। একপর্যায়ে সংস্থাপন মত্রণালয় থেকে সার্কুলার এলো, এক মাসের মধ্যে সব মন্ত্রণালয় ও বিভাগের নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে হবে। এর আগে সর্বত্র নিয়োগ প্রক্রিয়া বন্ধ করে আসা সার্কুলঅরে যেসব প্রতিষ্ঠানে ইতিমধ্যে প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে সেগুলো আওতার বাইরে রাখা হলো। তবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়েছে বিভিন্ন স্থান থেকে তখন এমন ছাড়পত্র নেয়ার যেন হিড়িক পড়ে গেল। শেষে যখন আর সময় নেই এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে নিয়োগ সম্পন্ন না করলে বিষয়টি ল্যাপস হয়ে যাবে বলে গুরুত্বসহকারে জানানো হলো তখন কেবলইমানবিক কারণে আমি প্রেসিডেন্টকে এ বিষয়ে জোর দিয়ে বললাম। প্রেসিডেন্টের কাছে এমএসপিকে ফাইলটি নিয়ে যেতে বললাম। আমি সেখানে থেকে এতগুলো লোকের রুটিরুজির প্রশ্নটি তুলে ধরলাম। কোথাও অন্যায় হলে সেটি বিধি অনুযায়ী দেখার ব্যাপারে কোন আপত্তি তো নেই একথাও জানালাম। তারপর র ফাইলে স্বাক্ষর করলেন। এর পর এতগুলো লোকের চাকরি হলো এবং তারা দিব্যি বঙ্গভবনে চাকরি করছেন। সবাই খুশি। মুয়াজ্জিন ছাড়া বাকিদের সঙ্গে আমার দেখাই হয়নি। তবে আমার অবদানের কথা এমএসপি অন্যদের বলেছিলেন।

বঙ্গভবনে প্রেস উইংয়ে অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী টেলে কাম ফ্যা অপারেটর পদটি দীর্ঘদিন শূন্য ছিল। প্রেস সচিবের পিও’র কাজ করতো স্টেনো। আমি গিয়েই আমার উইং েয়র সব শূন্য পদে নিয়োগের উদ্যোগ নিলাম। সচিব ও সংশ্লিষ্ট সবাইকে এ জন্য বার বার তাগাদা দিলাম। পিএসসি পিও পদে নিয়োগ দিতে বিলম্ব করছিল। পরে আমার পিওসহ চারটি শূণ্যপদে পিও নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে ভূমিকা রাখলাম। টেলিফোন কাম ফ্যা অপারেটর পদে বার বার ইন্টারভিউ বাতিল করা হচ্ছিলো। কোন কোন কর্মকর্তা পছন্দের আত্মীয়া নিয়োগের নাকি উদ্দেশ্য ছিল। যা হোক শেষ পর্যন্ত আমার চাপে স্বচ্ছতার সঙ্গেই নতুনভাবে ইন্টারভিউ নিয়ে এ পদে লোক নিয়োগ দেয়া হলো। তার চাকরি শুরু হতে হতে ততক্ষণে আমি বঙ্গভবন ছেড়ে এলাম। কিন্তু আমার স্বস্তি হচ্ছে শূন্য পদগুলো পূরণ করা সম্ভব হয়েছে। দীর্ঘ সময় বঙ্গভবনে সরকারি লোকজন প্রেস সচিবের পদে দায়িত্ব পালন করার পর বাইরে থেকে হঠাত আমাকে প্রেস সচিব নিযুক্ত করায় অনেকের শ্যেন দৃষ্টি পড়েছিল আমার ওপর। সরকারি কর্মকর্তাদের বাইরে বিশিষ্ট নাগরিকদের মধ্য থেকে যোগ্যতাসম্পন্নদের বিভিন্ন সরকারি পদে নিয়োগ প্রদানের অংশ হিসেবে যাদেরই নিয়োগ দেয়া হয় আমলারা তাদের সঙ্গে সহযোগিতা করেন না বলে শুনেছি। কিন্তু আমার যোগ্যতা, দক্ষতা ও দীর্ঘ অভিজ্ঞতা দিয়ে দায়িত্ব পালনের কারণে বরঞ্চ উর্দ্ধতন-অধস্তন সবার আমার সহযোগিতা নেয়াও ভাইস-ভার্সন বা রিসিপ্রোকাল পর্যায়ে আনা সম্ভব হয়েছে। আল্লাহ প্রদত্ত জ্ঞান, শিক্ষা, রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ সম্মান ও প্রটোকল এসার্ট করা ইত্যাদির ক্ষেত্রে আমার সহযোগিতামূলক ভূমিকা উল্টো বিভাগ ও মন্ত্রণালয়ের প্রধানদের সপ্রশংস সম্মান করতে হয়েছে। অনেকে বলতেন, জার্নালিস্ট টার্নড প্রেস সেক্রেটারী। পরে বলতেন, জার্নালিস্ট কাম পলিটিসিয়ান-মিনিস্টার-এডভাইজার ইত্যাদি। বন্ধুবর ড. মিজানুর রহমান শেলী কমনওয়েলথ সোসাইটির এক অনুষ্ঠানে আমার উপস্থিতিতে বলেই ফেললেন মোখলেস চৌধুরীর প্রতি আমার ঈর্ষা হচ্ছে যে, তিনি সচিব হয়ে মন্ত্রী হলেন। আমি আগে সরকারি চাকরি করে পরে মন্ত্রী হলেও প্রেসিডেন্টের মুখপাত্র বা সচিব হতে পারিনি। 

 

বঙ্গভবনের দিনগুলি - ৫

একজন কলামিস্ট যিনি আগে পদস্থ সরকারী কর্মকর্তা ছিলেন, বঙ্গভবনে আমি যোগ দেয়ার সঙ্গে সঙ্গে আমার বিরুদ্ধে এক গ্রন্থ লিখলেন। এতে কোন কোন সাংবাদিকের ইন্ধন ছিল এবং একজন সাংবাদিক ও বঙ্গভবনে তার ভাই এ লেখার সঙ্গে জড়িত বলে কয়েকজন সাংবাদিক আমাকে জানান। অবশ্য কলামিস্টটি আমার বিরুদ্ধে ব্যক্তিগত ক্ষোভের বশবর্তী হয়ে ইতিপূর্বেও লিখেছেন এবং বঙ্গববনে প্রেস সচিব হিসেবে যোগ দেয়ার পর লিখে এক কূটনৈতিক রিসিপশনে বন্ধুদের বললেন, বিরুদ্ধে লিখলেই দেখি তার আরও প্রমোশন হয়। এরপর আল্লাহ আমাকে প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা বানিয়েছেন। এর আগে আমি ওকাবে থাকাকালে তিনি লেখার পর আমি ওকাবের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হই। ব্যাক্তিগত পর্যায়ে তিনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বরাবরেও আওয়ামীলীগ আমলে আমার বিরুদ্ধে পাচ পাতার দরখাস্ত দিয়েছিলেন এবং তাতে লিখেছেন, বিষয়: মোখলেসুর রহমান চৌধুরী। আব্বা যখন চাকরীকালে অধীনস্তদের বস ছিলেন তখন তারা যে আড়ালে ষড়যন্ত্র ও হিংসা করতেন তা তিনি বুঝতেন। আব্বা বলতেন আল্লাহ চুল ধরে টানলে বান্দা পায়ে ধরে টেনে কিছু করতে পারবে না। আমার বিরুদ্ধে লোকজনের ষড়যন্ত্রের সময় পিতার কথাই সবচেয়ে বেশী মনে পড়ে।

পরবর্তীখালে বঙ্গববনে একটা টিমের মত কাজ করেছি। দেশ ও প্রেসিডেন্টের মান-মর্যাদা ইমেজ তুলে ধরতে আমাদের কার্যক্রম স্মৃতিপটে এখনও জ্বলজ্বল করে ভাসে। পরে সেই কর্মকর্তারা স্বীকার করেন, প্রথমে তারা আমাকে আন্ডার এস্টিমেট বা আন্ডারমাইন করেছিলেন। জাতীয় স্বার্থ ছিল আমাদের কাছে সবোর্চ্চ অগ্রাধিকার। অনেক পদস্থ লোকজন খুশি করতে গিয়ে আমাকে সেলফ মেইড ম্যান আখ্যা দিলেন। আর অনেকে বললেন, আপনার দেশে বিদেশে যে ক্রেডেনশিয়াল হয়েছে তা শত্রুতা ছাপিয়ে গেছে।

বঙ্গভবনে আগে প্রেস সেক্রেটারীর কোন অনার বোর্ড ছিল না। ফলে আগে কে কে প্রেস সচিব ছিলেন তা এ অফিসে যারা আসতেন তারা জানতে পারতেন না। আমি সেখানে যোগ দিয়েই স্বাধীনতার পর থেকে সচিবদের যোগদান ও বিদায়ের নথিপত্রের দিন তারিখ ঘেটে এবং সংশ্লিস্টদের সাথে যোগাযোগ করে আপডেট বা হালনাগাদ তালিকা তৈরী করে প্রেস সচিবের রুমে অনার বোর্ড স্থাপন করি। দিনরাত কাজ করার কারনে রুমের মধ্যে একটি বোর্ড স্থাপন করি, যেটি ডা. এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরী প্রেসিডেন্ট থাকাকালে রোগী দেখার কাজে ব্যবহার করতেন। ১১ জানুয়ারী ২০০৭ যারা বঙ্গভবনে গেছেন তারা দেখেছেন এই বোর্ডেই আমার ব্যাক্তিগত চিকিৎসক আমার ইসিজি ইকো ইত্যাদি করেছিলেন। প্রেসিডেন্টের উপদেস্টা হিসেবে এ রুমেই আমার নেমপ্লেট লাগানো ছিল। উপদেষ্টা হিসেবে আমার পিএস, যিনি সরকারের উপসচিব, তার ও আমার এপিএস এর জন্য বঙ্গভবনের দোতালায় সাদা কাচ দ্বারা দুটি দৃষ্টি নন্দন বড় রুম করা হয়েছিল। এখনো যারা বঙ্গভবনে যান তাদের কাছে এগুলো আমার স্মৃতি হয়ে রয়েছে।

বঙ্গভবনে প্রেস উইং ছিল সবচেয়ে উপেক্ষিত ও অবহেলিত। বঙ্গভবন ডায়েরীতে প্রেস উইংকে প্রেস শাখা লেখা হয়েছিল। এ নিয়ে সরকারী কর্মকর্তাদের উপর সঙ্গত কারনেই আমি ক্ষুদ্ধ হয়েছিলাম। তারা বললেন স্যার আমরা তো ডায়রীতে এভাবেই লিখে আসছিলাম। আগেতো স্যাররা কেউ এভাবে বলেননি। আমি বললাম কোন পদস্থ কর্মকর্তা কোন উইং কিংবা বিভাগ এবং সবোর্পরি যার যা প্রাপ্য তা থেকে বঞ্চিত ও অমর্যাদা করা চলবে না। ডায়রী সংশোধীত হলো, কর্মকর্তারা ক্ষমা চাইলেন। প্রেস সচিব ছাড়াও উপ-প্রেস সচিব ও সহকারী প্রেস সচিব নামে প্রথম শ্রেণীর দুটি পদ আছে প্রেসিডেন্টের প্রেস উইং এ। অথচ প্রেসিডেন্টের প্রেস উইং এ গিয়ে দেখি দুজন পিয়ন। প্রেস সচিবের জন্য একজন নির্ধারিত। এরপর বাকী দুজন কর্মকর্তা, অফিস সাপ্তাহিক ছুটির দুদিন সহ প্রতিদিন প্রেস ক্লিপিং করা এসব মিলিয়ে একজন পিয়ন বরাদ্দ। দেশের সবোর্চ্চ অফিসে এ ব্যবস্থা কল্পনা করাই যায় না। উপজেলা পর্যায়ে একজন কর্মকর্তার কি অবস্থা তা সহজেই অনুমেয়। এছাড়া অমাদের সহকারী প্রেস সচিবও উইএনও সম মানের। প্রেসিডেন্ট পদ্ধতির সরকার থেকে প্রধানমন্ত্রী শাসিত সরকার চালু হলে বঙ্গভবনকে এভাবে প্রাপ্য সুবিধাদি থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে। আমলারা এ কাজ করলেও তার দায় পলিটিশিয়ানদের নিতে হয়েছে। প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিব ছাড়াও আগে য্রেস উইংয়ে তিনজন উপ-প্রেস সচিব ও তিনজন সহকারী প্রেস সচিব দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন।সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে এই সেটআপ প্রধানমন্ত্র অফিসে চলে গেল। আর প্রেসিডেন্ট অফিসে ডিপিএস ও এপিএসের সংখ্যা একজন করে কবে হলো। আমলাতান্ত্রিক ব্যাপার এমনই হয়েছিল যে, প্রেসিডেন্ট অফিসে প্রেস উইংয়ের পরিবর্তে পিআরও বা জনসংযোগ কর্মকর্তা দেয়ার চিন্তা পর্যন্ত হয়েছিল।কিন্তু সর্বোচ্চ অফিস হওয়ার কারণে প্রেসিডেন্টকে টিটুলার হেড দেখিয়ে শেষ পর্যন্ত সেটআপ এভাবে সংকাচিত করা হয়।

যা হোক, এরপর প্রেস উইংয়ের পিয়নের সংখ্যা চারজনে উন্নীত করি। এক পর্যায়ে প্রেসিডেন্টের অভিপ্রায় অনুযায়ী দিনে দু’বার প্রেস ক্লিপিংও চালু করতে হয়েছিল। পরে প্রেসিডেন্টের অসুস্থ হয়ে যাওয়ার পর কাজ আরো বেড়ে গেলে কিপ্লিং যথা পূর্বং তথা পরং তথা আগের মতোই একবার হয়ে যায়। আমি প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা বা মন্ত্রী হলে মন্ত্রীর অর্গানোগ্রাম অনুযায়ী আমার আাদা স্টাফ আসেন।তাদেরকেও আমি প্রেসিডেন্টের কার্যক্রম ও প্রেস উইংয়ের কাজে নিয়োজিত করি। রাষ্ট্রীয় দায়িত্বের ক্ষেত্রে অফিসটি সকল কর্মকান্ডের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে পড়ে। সবাইকে সততার সাথে দায়িত্ব পালন করতে কঠোর নির্দেশ জারি করি। আমি চলে আসার পর প্রেস সচিবের রুম থেকে বেডটি৫ সরিয়ে ফেলা হয়। পিয়নও একজন প্রত্যাহার করে নেয়া হয়। আমার পিএস ও এপিএসের দুটি দৃষ্টিনন্দন রুম করে দেয়ায় এখন ডেপুটেশনে আতরাসহ অন্যরা এরবং অফিসের জরুরি কাগজপত্র রাখা ইত্যাদি কারণে এগুলো ব্যবহার করতে পারছেন। বঙ্গভবন যেহেতু রাষ্ট্রীয় হেরিটেজ বিল্ডিং, সেজন্য এত কোনো ধরনের পরিবর্তন বা সংস্কার আমরা করিনি। এর হেরিটেজ ক্যারেক্টার ঠিক রেখে ওই রুম দুটি করার নির্দেশ দিয়েছিলাম। উপ-প্রেস সচিবকে অফিসে আনা নেয়ার জবন্য অন্যদের সঙ্গে যৌথভাবে গাড়ির ব্যবস্থা ছিল। আমি অফিসের প্রয়োজনে তার সার্বক্ষণিক গাড়িরও ব্যবস্থা করেছিলাম। প্রেস সেক্রেটারিকে বলা হয় রাষ্ট্র বা সরকারপ্রধানের চক্ষু-কর্ণ-নাসিকা। তিনি প্রেস উইংয়ের কর্ণধর। কোরআনে আল্রাহ তা’লা নেতা বা বসের প্রতি আনুগত্য বজায় রাখার নির্দেশ দিয়েছেন। বিভিন্ন দেশে এসব বিষয় নির্দেশ আকারে থাকে। এইচএম এরশাদ প্রেসিডেন্ট থাকাকালে তার রুমে প্রেসিডেন্টের চেয়ারের পেছনে লেখা ছিল-‘ফলো টু ইনস্ট্রাকশন। নাম্বার ওয়ান- বস ইজ অলওয়েস রাইট। নাম্বার টু-ফলো নাম্বার ওয়ান ইনস্ট্রাকশন।‌‌‌’

অর্থাৎ ঘুরে ফিরে দেয়ালে ফ্রেমবন্দি একই নির্দেশ অনুসরণ করতে হয়। রাষ্ট্রপ্রধান বা সরকারপ্রধান কোই পদ ধরে রাখতে পারেন না। তাদের পদকে যথাযথ করে রাখার জন্যই তাদের সহযোগিতার জন্য সর্বোচ্চ র্যায়ের কর্মকর্তা এখানে নিয়োগ দেয়া হয়। তাদের এইড বা সহযোগীরা হচ্ছেন এসব পদের এক্সটেনশন। অন্যান্য মন্ত্রণালয় ও ভিাগ থেকে সিনিয়র কর্মকর্তা ও সামরিক কর্মকর্তাদের রাষ্ট্রীয় সর্বোচ্চ ভবনে নিয়োগ নজির রয়েছে। এর উদ্দেশ্য হচ্ছে যাতে সর্বোচ্চ ভবনের সিকিউরিটি ও মর্যাদা ধরে রাখা সম্ভব হয়। বঙ্গভবনে জুনিয়র কর্মকর্তা নিয়োগ দিলে তাকে বঙ্গভবনের অধিনস্থ অন্য অফিসগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তাকে উল্টো স্যার কলতে হবে। এতে কাজ করদেও অসুবিধা হয়। আমাদের দেশে এই অসুবিধার ঘটনাও দীর্ঘকাল ধরে হয়ে আসছে। এদেশে সরকার পদ্ধতি পরিবর্তনকারলে প্রেসিডেন্টের প্রেস উইংকে কেবল সংকুচিত করা হয়নি, সরকারী ক্যাডার কর্মকর্তাদের মধ্য থেকে নিয়োগ দেয়ার ক্ষেত্রে প্রেসিডেন্টের প্রেস সচিবের নূন্যতম মর্যাদা করা হয়েছে যগ্ন সচিব পর্যায়ের। অবশ্য বাইরে থেকে নিয়োগদান কালে ব্যক্তিকে কেন্দ্র করে পদমর্যাদা দেয়া হয়। বলা হয়, চেয়ার মেকস এ ম্যান পারফেক্ট তো রয়েছেই। বঙ্গভবনে বিভিন্ন সময়ে সচিব ও উপমন্ত্রি মর্যাদা দিয়ে প্রেস সচিবের দ্বায়িত্ব যথাক্রমে প্রেস সচিব, প্রেস কলসালটেন্ট ও প্রেস এডভাইজেরের ওপর ন্যস্ত করা হয়। আমি প্রেস এডভাইজর বা তথ্য উপদেষ্টা এবং এর আওতায় কেবল প্রেসই নয়, রাষ্ট্রীয় সকল বিষয় অন্তর্ভুক্ত ছিল। প্রেসিডেন্টকে সার্বিকভাবে উপদেশ দেয়া, নীতিনির্ধারণে সহযোগীতা ও সকল রাষ্ট্রীয় দ্বায়িত্ব পালন ছিল আমার আওতাভুক্ত। অন্য কথায়, চন্ডিপাঠ থেকে জুতা সেলাই সবই ছিল দায়িত্বের আওতাভুক্ত। মোদ্দা কথায়, পরম করুনাময় আল্রাহ তালা আমাকে সমগ্র দেশের একটি ফোরাম দিয়েছেন। ফোরামের আমার সামনে রয়ে গেছে। দেশ ও দেশ ছাড়িয়ে আমাদের বাংলাদেশী, বাঙ্গালীও বাংলাভাষী জনগণ এবং সংশ্লিষ্ট সম্পর্কিত কূটনৈতিক ও অন্যান্য মহলের যে যোগসূত্র আমার জন্য তৈরি হয়েছে তা আমার জন্য এক বিরাট সম্পদ। দীর্ঘকাল পেশাগত জীবনে অর্জিত আমার সেই সম্পদও রয়ে গেছে।

দায়িত্ব দেখে পেছনে চলে যাওয়পা নয়, সমুদ্রে ঝাপ দেয়ার মতো সামনে এগিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নিয়েই ছোটবেলা থেকে বেড়ে উঠি। বঙ্গভবনে হাটাচলা, খাওয়া, প্রেসিডেন্টের সঙ্গে মিটিং-অনুষ্ঠান ইত্যাদীতে প্রটোকল সর্ব্বোচ্চ অগ্রাধিকার। ছোটবেলা থেকেই ফরমাল লাইফ লিড করেছি লোকজনের সঙ্গ। কোথাও যেন পান থেকে চুন খসে না পড়ে সেজন্য ওয়ারেন্ট অব প্রেসিডেন্স, রুলস অব বিজনের, রেড বুক ইত্যাদি বেশ আগেই রজ্ত করে নিয়েছিলম। আগে দীর্ঘকাল সংসদ বিষয়ে সাংবাদিকতা করতে গিয়ে সংবিধান, রুলস অব প্রসিডিউর, সাংবিধানিক, সংশোধনী বিল, সাধারণ বিল ও সংসদীয় অন্যান্য বিধানবলীতে এভাবেই ব্যুৎপত্তি অর্জন করি। আইনজীবী হওয়ার জন্যে নয়, আইন সম্পর্কে সচেতন হতে ল’-এর দুটি পার্ট কমপ্লিট করেছিলাম। আমার লেখা দুটি বই ‘প্রটোকলের নিগড় ও সমকালীন সাংবাদিকতা’য় প্রটোকল এবং সাংবাদকতা সম্পর্কে অনেক কিছু শিক্ষণীয় আছে। প্রেসিডেন্ট প্রফেসর ড. ইয়াজউদ্দীন আহম্মেদ বই দুচোর প্রকাশনা অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন। প্রটোকলের নিগড় ইতিমধ্যে দ্বিতীয় দফায়ও প্রকাশিত হয়েছে। দেশ-বিদেশে উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে এগুলো পড়ানো হয়। এছাড়া স্টেটক্রাফট, গভর্নেন্স, গভর্নমেন্ট এন্ড পলিটিক্স, কমউনিকেশন্স, জার্নালিজম, ইন্টারন্যাশনাল রিলেশন্স, ডিপ্লোমেসি ও কনটেমপরারি ওয়ার্ল্ড নিয়ে আমি উচ্চ শিক্ষার্থীদের পড়াই। জার্নালিজমে মাস্টার্স এবং সাংবাদিকতায় জাতীয় আন্তর্জাতিক অনেক ট্রেনিং নেয়ার পর নব্বই দশক থেকে আমি সিনিয়র সাংবাদিকদেরও ক্লাস নিয়ে আসছি।